Sunday, August 2, 2026
Homeসারাদেশ‎'গণপূর্তের মাফিয়া' গণপূর্ত সার্কেলের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী আরিফ

‎’গণপূর্তের মাফিয়া’ গণপূর্ত সার্কেলের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী আরিফ

গণপূর্ত সার্কেল-১ এর শার্ট মুদ্রাক্ষিক পিএ ‎তিনি। তবে তারচেয়েও তার বড় পরিচয় তিনি এখন ‘গণপূর্তের মাফিয়া’। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও তিনি দীর্ঘ এক যুগ যাবৎ সার্কেল-১ এ আছেন। মাসিক বেতন খরচ না করেও তিনি রাজকীয় জীবনযাপন করেছেন তিনি। বলছি গণপূর্ত সার্কেল ১ এর ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী আরিফ হোসেনের কথা। এমন কোন অনিয়ম নেই যার সাথে তার নাম জড়ায়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপূর্তের সকল দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার টাকার লেনদেন হয় এই আরিফের মাধ্যমে। এমনকি সাংবাদিকরা নিউজের বিষয় কোনো কর্মকর্তাকে ফোন দিলে ৫মিনিটের মধ্যে সেই সাংবাদিককে ফোন দেয় আরিফ। প্রথমে সিনিয়র কিছু সাংবাদিকের নাম বিক্রি করে হুমকি, পরে কাজ না হলে টাকা দিয়ে নিউজ বন্ধ করার চেষ্টা করে আরিফ। তবে অনেক সাংবাদিকদের সাথে আরিফের অর্থনৈতিক লেনদেন থাকার কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছে আরিফ। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার কিছু গণমাধ্যমে নিউজ হলেও তৎকালীন আওয়ামী আমলে প্রভাব খাটিয়ে সেসকল নিউজ সরিয়ে ফেলে।

‎গণপূর্তের সূত্র মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-১-এ কর্মরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আরিফ হোসেনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অযাচিত হস্তক্ষেপ, সাংবাদিকদের হয়রানি, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার এবং সরকারি সুবিধা অপব্যবহারের নানা অভিযোগ উঠেছে।
‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্তের কর্মকর্তা বলেন, তিনি একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও বাস্তবে তার প্রভাব অনেক কর্মকর্তার চেয়েও বেশি। তিনি যা চান তাই হয়। ক্ষমতাসীনদের ম্যানেজ করে তিনি এসব অপকর্ম করেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ও তিনি একই কাজ করতেন, এখনো করেন। রেজিম চেঞ্জ হলেও তার প্রভাব একটুও কমেনি।

‎জানা গেছে, ৫ আগষ্টের আগে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ছিলেন আরিফ হোসেন। ৫ আগষ্টের পরে তার এলাকার আতিক নামে এক সাংবাদিকের মাধ্যমে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামলকে নিয়ে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি করে। এতে বেশ কয়েকজন মিলে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেন। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা বর্তমানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

‎আরিফ হোসেন প্রায় এক যুগ ধরে একই দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। সাধারণত দীর্ঘ সময় একই সংবেদনশীল কর্মস্থলে অবস্থান করলে প্রভাবের বলয় তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

‎গণপূর্তের কর্মকর্তারা বলেন, এই দীর্ঘ কর্মস্থল-অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেন। তবে তাকে একই কর্মস্থলে রাখার কারণ কী, সে বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেই।

সাংবাদিকদের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন আরিফ হোসেন। কোনো সাংবাদিক গণপূর্তের কোনো কর্মকর্তা বা প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টি দ্রুত আরিফ হোসেন জানতে পারেন। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ফোন করেন অথবা তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন সাংবাদিকের মাধ্যমে যোগাযোগ করে সংবাদ প্রকাশে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেন এবং ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হলে নানা হুমকি-ধামকি দেন বলে জানান এক ভুক্তভোগী সাংবাদিক।

‎তিনি বলেন, গণপূর্তের অনিয়মের একটি
‎সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে বাধা ও মানসিক চাপ তৈরি করেন আরিফ হোসেন। তাকে এক্ষেত্রে সাহায্য করেন কিছু সাংবাদিক ও অসাধু কর্মকর্তা। এবং কোনো কর্মকর্তাকে নিউজের জন্য ফোন দিলেই আরিফ হোসেন ওই সাংবাদিককে ফোন দেয় ও তার সিন্ডিকেটের সাংবাদিকদের দিয়ে ফোন দিয়ে নানা হয়রানি করে।

‎আরিফ হোসেনের আর্থিক বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে জনতা ব্যাংকের রমনা শাখায় জমা হওয়া বেতনের অর্থ উত্তোলন করেননি। অভিযোগকারীদের মতে, এটি তার প্রকৃত আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিগত ফ্যাসিস্টের ১০ বছরে জনতা ব্যাংক রমনা শাখা থেকে বেতনের এক টাকাও উঠায়নি। এতে তার আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য কর্তৃপক্ষ অজানা কারণে চুপ। ‎এছাড়া সরকারি বাড়ি ভাড়া ও ভাতা ঘিরেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়।

অভিযোগকারীদের দাবি, আরিফ হোসেন ও তার স্ত্রী—উভয়েই সরকারি চাকরিজীবী। সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে দুজনই বাড়িভাড়া ভাতা গ্রহণ করছেন, যা সরকারি অর্থের অপব্যবহারের শামিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী তাদের ভাতা গ্রহণ অবৈধ বলে নিশ্চিত করেছে গণপূর্তের একটি সূত্র।

‎সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া জরুরি।

‎জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে অবস্থান, অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বলয় এবং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেমন দায়মুক্তি পাবেন, তেমনি অভিযোগ সত্য হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

‎দুর্নীতি দমন ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো সরকারি কর্মচারীর আয়-ব্যয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠলে তা যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থা, বিশেষ করে প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের। একইভাবে সরকারি ভাতা, বদলি নীতি বা প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত।
‎এই প্রতিবেদনের জন্য আরিফ হোসেনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পর্কিত খবর

জনপ্রিয় সংবাদ